নরসিংদী সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনার পর নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে একই অফিসের নকলনবিশ হাসিবুলের দায়িত্ব পাওয়া নিয়ে। রশিদসংক্রান্ত জালিয়াতির অভিযোগের কথা উল্লেখ করেছেন অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা সাব-রেজিস্ট্রার মো. মাহাবুব হোসেন। এর মধ্যেই হাসিবুলকে ওই অফিসে করণিকের দায়িত্ব দেওয়ায় বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
গত আগস্টে নরসিংদী সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি পোস্ট ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে অফিসটিকে ‘দুর্নীতির আখড়া’ উল্লেখ করে দুর্নীতিমুক্ত সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের দাবি জানানো হয়। পোস্টটি ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি গণমাধ্যমেও আসে এবং এ নিয়ে বিভিন্ন সংবাদ প্রকাশিত হয়।
এরই মধ্যে অভিযোগের আলোচনায় থাকা একই অফিসের নকলনবিশ হাসিবুলকে করণিকের দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে, যাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের কথা আলোচিত হয়েছে, তাঁর দায়িত্ব পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত কী প্রক্রিয়ায় নেওয়া হয়েছে এবং এ বিষয়ে কোনো তদন্ত বা প্রশাসনিক যাচাই হয়েছিল কি না।
শিবপুর উপজেলার সাব-রেজিস্ট্রার মো. মাহাবুব হোসেন সপ্তাহে দুই দিন অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে নরসিংদী সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি স্বাক্ষর জালের অভিযোগ অস্বীকার করলেও রশিদসংক্রান্ত অনিয়মের কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, অফিসের রশিদ বই চুরি করে সরিয়ে রাখার ঘটনাও ঘটেছে।
সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের ভাষ্য, শিবপুর উপজেলার পুটিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা হাসিবুল আগে নরসিংদী সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের তৎকালীন করণিক শফিকের সহযোগী হিসেবে কাজ করতেন। তবে শফিকের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে কোনো স্বাধীন তদন্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় দলিল লেখক, সেবাগ্রহীতা ও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, নকলনবিশ, দলিল লেখক ও করণিকদের একটি প্রভাবশালী বলয় দীর্ঘদিন ধরে অফিসের কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করে আসছে। জমি নিবন্ধন, দলিলের নকল উত্তোলনসহ বিভিন্ন সেবা নিতে গিয়ে হয়রানি এবং অতিরিক্ত অর্থ দাবির অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র তদন্ত হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
নরসিংদী সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত করণিক মাহবুব রহমানের কাছে হাসিবুলের দায়িত্ব পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, **“আসলে উপর থেকে যখন ফোন আসে তখন আমাদের করার কিছুই থাকে না।”**
নরসিংদী সদর দলিল লেখক সমিতির সভাপতি রফিকুল ইসলাম ভূঁইয়ার কাছে বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তিনি অবগত নন। সরকারি অফিসে কাকে কোথায় দায়িত্ব দেওয়া হবে, সেটি কর্মকর্তারা বলতে পারবেন বলেও জানান তিনি। দলিল লেখক সমিতির অনুমতি ছাড়াই কর্মকর্তারা এমন আদেশ দিতে পারেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে অসুস্থতার কথা জানিয়ে পরে কথা বলবেন বলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন তিনি।
নরসিংদী সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করা সাব-রেজিস্ট্রার মো. মাহাবুব হোসেন বলেন, **“আমি শিবপুরের দায়িত্বে আছি। এখানে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছি। তাই এই বিষয়টা আমি অবগত নই।”**
জেলা রেজিস্ট্রার মুহাম্মদ আরিফুর রহমান বলেন, নরসিংদী সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস নিয়ে আগে পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে তিনি অবগত নন। হাসিবুলের অতীত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ সম্পর্কেও তিনি জানেন না বলে জানান।
তিনি বলেন, বিষয়গুলো তিনি আগে জেনে নেবেন।
সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে জমি নিবন্ধন ও সম্পত্তি হস্তান্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ফলে রশিদ জালিয়াতি, রশিদ বই সরিয়ে নেওয়া, দায়িত্ব বণ্টন এবং অনিয়মের অভিযোগ থাকলে সেগুলো যথাযথভাবে যাচাই করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যাঁকে ঘিরে রশিদসংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে, তাঁকে করণিকের মতো দায়িত্ব দেওয়ার আগে কোনো প্রশাসনিক যাচাই বা তদন্ত হয়েছিল কি না। জেলা রেজিস্ট্রারের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি বিষয়গুলো সম্পর্কে আগে অবগত ছিলেন না। ফলে হাসিবুলের দায়িত্ব পাওয়ার প্রক্রিয়া এবং তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই নজর সংশ্লিষ্টদের।